Time ****** KMT(+3.00)

কারবালার হৃদয় বিদারক ইতিহাস

কারবালার হৃদয় বিদারক ইতিহাস, মুক্বাদ্দিমাতুল কিতাব 
الحمد لله رب العلمين والصلاة والسلام على سيد الانبياء والمرسلين محمد وعلى اله الطيبين وازواجه المتطهرين واصحابه المرضين وعلى اولاده الشيح المجدد الاعظم وامام الشريعة والطريقة والاولياء الكاملين. ولاتحسبن الذين قتلوا فى سبيل الله امواتا بل احياء عند ربهم يرزقون
অর্থ: ‘যাঁরা আল্লাহ তায়ালার রাস্তায় শহীদ হন তাঁদেরকে কখনও মৃত মনে করো না বরং তাঁরা নিজেদের রব তায়ালার নিকট জীবিত রিযিকপ্রাপ্ত’ (সূরা আলে ইমরান-১৬৯)
হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাত নিঃসন্দেহে মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে হৃদয় বিদারক ঘটনা নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হায়াত মুবারকে উনার বিছাল শরীফ-এর পরে আরো অনেক মর্মবিদারক শাহাদাতের ঘটনা ঘটেছে কিন্তু হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাতের ন্যায় এত দীর্ঘস্থায়ী এত ব্যাপক শোক, কান্না আহাজারি মুসলিম জাতি আর কোন শাহাদাতের জন্য করেনি উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হায়াত মুবারকে হযরত হামযা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার শাহাদাত, তাঁর কলিজা চিবানো, হযরত ইয়াসার রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার পরিবারের মর্মান্তিক শাহাদাত, বীরে মাঊনায় ৭০ জন এবং ইয়ামামার যুদ্ধে ৩০০ জন কুরআনে হাফিযের শাহাদাত, হযরত খুবাইব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাত তৎকালীন মুসলিম সমাজের বুকে শেলের মত বিঁধেছিল স্বয়ং আখিরী রসূল, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হামযা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার শাহাদাতে নিদারুণভাবে শোকাহত হয়েছিলেন তারপর চারজন খলীফার মধ্যে হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুসহ তিনজন খলীফাই শহীদ হয়েছেন মর্মান্তিকভাবে জামাল (উষ্ট্রের) যুদ্ধ সিফ্ফীন যুদ্ধের ন্যায় দুটি গৃহযুদ্ধে বহু মূল্যবান প্রাণ, বিশেষতঃ আশারায়ে মুবাশ্শারার অন্তর্ভুক্ত কয়েকজন ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমও শহীদ হয়েছেন এসব শাহাদাতে মুসলমানদের শক্তি প্রভাব-প্রতিপত্তির অপূরণীয় ক্ষতি হলেও শোক আবেগের দিক দিয়ে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাত ঐসব শাহাদাত থেকে অধিক মর্মান্তিক এমনকি সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বড় ভাই সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম উনাকে বিষ প্রয়োগে শহীদ করা হয়েছিল কিন্তু সেই শাহাদাত নিয়েও সারা দুনিয়াব্যাপী এত দীর্ঘস্থায়ী শোক বিলাপ হয়নি, যেমনটি সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাতে হয়েছিল এবং হচ্ছে

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাত এমন এক শাহাদাত এবং এমন এক হৃদয় বিদারক ঘটনা, যা আগের এবং পরের যুগে, যার কোন নজীর নেই

ইয়াযীদের মসনদ দখল
আমীরুল মুমিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার বিছাল শরীফ-এর পর ইয়াযীদ সিংহাসনে আরোহন করলো এবং আরোহন করার সাথে সাথেই তার মনের মধ্যে সীমাহীন অহঙ্কার গর্ববোধের সৃষ্টি হলো যার ফলে এমন কাজ-কর্ম শুরু করলো, যা শরীয়তের সম্পূর্ণ খিলাফ প্রায় মানুষ- ক্ষমতার মোহে ধরাকে সরা জ্ঞান করে যেমন; ফিরআউন প্রথমে গরীব ছিল, কিন্তু ভাগ্যক্রমে বাদ্শা হয়ে সিংহাসনে আরোহন করার সাথে সাথে এমন অহঙ্কারী হয়ে বসলো যে, শেষ পর্যন্ত নিজেকে খোদা বলে ঘোষণা করলো (নাঊযুবিল্লাহ)
সে বলতে লাগলো, ‘আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় খোদা আমার পূজাআরাধনা কর সে- রক্ষা পাবে যে আমার পূজা করবে আর যে আমার পূজা করতে অস্বীকার করবে, তাকে আমি খতম করবো কারণেই সে অনেক লোককে হত্যা করেছিল, যারা তাকে মাবূদ মানতে অস্বীকার করেছিলেন তদ্রুপ ইয়াযীদও যখন সিংহাসনে বসলো, সে ক্ষমতায় আরোহন করার পর পরই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম, হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু প্রমুখ থেকে বাইয়াত তলব করলো একেতো উনারা ছিলেন ছাহাবী, বিশেষ সম্মানিত ব্যক্তি এবং উনারা বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বংশধর ছিলেন তাই তাঁরা কিভাবে ফাসিক-ফাজির ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত করতে পারেন? সুতরাং তাঁরা অস্বীকার করলেন এবং এটা তাঁদের মর্যাদাগত সদাচরণই ছিল অস্বীকার করার পর হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মদীনা শরীফ থেকে মক্কা শরীফে চলে গেলেন

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম মদীনা শরীফ-এর গভর্নর ওয়ালীদের আহবানে তার দরবারে তাশরীফ নিলেন তার সঙ্গে আলোচনা করলেন মদীনা শরীফ-এর গভর্নর বললো, ইয়াযীদ আপনার বাইয়াত তলব করেছেন তিনি বললেন, ‘আমি ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত করতে পারি না ইয়াযীদ হলো ফাসিক-ফুজ্জার, ধরণের অনুপযুক্ত লোকের হাতে আমি বাইয়াত করতে পারি না আমি কোন অবস্থাতেই তার হাতে বাইয়াত করতে রাজী নইতিনি সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করলেন এটা তাঁর মর্যাদাগত সদাচরণই ছিল

ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম অস্বীকারের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করে দিলেন, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম শত কষ্ট-যাতনা ভোগ করতে পারেন, অনেক বিপদ-আপদের মুকাবিলা করতে পারেন, এমন কী আপন পরিজনের সমস্ত লোকদের নির্দয়ভাবে শহীদ হওয়াটা অবলোকন করতে পারেন; নিজেও জালিমদের হাতে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করতে পারেন, কিন্তু ইসলামের নিযাম বা বিধান ছত্রভঙ্গ হওয়া কিছুতেই সহ্য করতে পারেন না নিজের নানাজান হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দ্বীন ধ্বংস হওয়াটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম নিজের কাজ কর্মপন্থা দ্বারা তা প্রমাণ করেছেন এবং দুনিয়াবাসীকে এটা দেখিয়ে দিয়েছেন, আল্লাহ তায়ালার মনোনীত খাছ বান্দাগণের এটাই শান যে, বাতিলের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে যান এবং তীর তলোয়ারের সামনে বুক পেতে দেন, কিন্তু কখনও বাতিলের সামনে মাথা নত করেন না

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মক্কা শরীফ-এর উদ্দেশ্যে গমনঃ
হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এভাবে মদীনা শরীফ-এর গভর্নর ওলীদের বেয়াদবীপূর্ণ প্রস্তাব অস্বীকার করে যখন তার দরবার থেকে নিজের আপনজনদের কাছে ফিরে আসলেন এবং সবাইকে একত্রিত করে বললেন, আমার প্রিয়জনেরা! যদি আমি পবিত্র মদীনা শহরে অবস্থান করি, এরা আমাকে ইয়াযীদের বাইয়াত করার জন্য বাধ্য করবে, কিন্তু আমি কখনও বাইয়াত গ্রহণ করতে পারবো না তারা বাধ্য করলে নিশ্চয়ই যুদ্ধ হবে, ফাসাদ হবে; কিন্তু আমি চাইনা আমার কারণে মদীনা শরীফ- লড়াই বা ফাসাদ হোক আমার মতে, এটাই সমীচীন হবে যে, এখান থেকে হিজরত করে মক্কা শরীফ- চলে যাওয়া জবাবে তারা বললেন, ‘আপনি আমাদের অভিভাবক; আমাদেরকে যা হুকুম করবেন তাই মেনে নেবঅতঃপর তিনি মদীনা শরীফ থেকে হিজরত করার সিদ্ধান্ত নিলেন আহ! অবস্থা কেমন সঙ্গীন হয়ে গিয়েছিল যে, ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে সেই মদীনা শরীফ ত্যাগ করতে হচ্ছিল, যে মদীনা শরীফ- হযরত ইমাম আলাইহিস সালাম উনার নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রওযা শরীফ অবস্থিত ক্রন্দনরত অবস্থায় তিনি নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রওযা পাক- উপস্থিত হয়ে বিদায়ী সালাম পেশ করলেন এবং অশ্রুসজল নয়নে নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অনুমতি নিয়ে আত্মীয়-পরিজন সহকারে ৬০ হিজরী ৪ঠা শাবান তারিখে মদীনা শরীফ থেকে হিজরত করে মক্কা শরীফ- চলে গেলেন

মক্কা শরীফ- গমনের কারণঃ
মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ ফরমান
- ومن دخله كان امنا
অর্থ: ‘যে হেরেম শরীফ- প্রবেশ করলো, সে নিরাপদ আশ্রয়ে এসে গেল’ (সূরা আলে ইমরান-৯৭)
কেননা হেরেম শরীফ-এর অভ্যন্তরে ঝগড়া-বিবাদ, খুন-খারাবী নাজায়িয হারাম এমনকি হেরেম শরীফ-এর সীমানায় মশা মারা পর্যন্ত নিষেধ তবে সাপ, বিচ্ছু ইত্যাদি মারতে পারে কিন্তু যে সব পশু-পাখি মানুষের কোন ক্ষতি করে না সেগুলো মারা জায়িয নেই আর মুমিনদের ইজ্জত-সম্মান তাঁদের শান-মান এটাতো অনেক ঊর্ধ্বের বিষয় তাই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম চিন্তা করলেন যে, হেরেম শরীফ-এর অভ্যন্তরে যেহেতু ঝগড়া-বিবাদ, খুন-খারাবী নিষেধ সেহেতু কেউ আমার সাথে এখানে ঝগড়া-বিবাদ করতে আসবে না তাই হেরেম শরীফ-এর সীমানায় অবস্থান করে মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত বন্দেগীতে বাকী জীবন কাটিয়ে দিবেন মনোভাব নিয়ে তিনি মদীনা শরীফ থেকে মক্কা শরীফ- চলে আসলেন

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে কূফাবাসীর চিঠিঃ
মক্কা শরীফ আগমনের সাথে সাথে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে কূফা থেকে লাগাতার চিঠিপত্র এবং সংবাদ-বাহক আসতে শুরু করলো অল্প সময়ের মধ্যে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে দেড়শত চিঠি এসে পৌঁছল উলামায়ে কিরাম-এর কেউ কেউ তাঁদের কিতাবে বারশত চিঠির কথা উল্লেখ করলেও নির্ভরযোগ্য কিতাবে দেড়শত চিঠির কথা উল্লিখিত রয়েছে

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে পাঠানো প্রত্যেকটি চিঠির বিষয়বস্তু খুবই আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ছিল বিষয়বস্তুগুলো হচ্ছে এরকম, "হে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম! আমরা আপনার সম্মানিত পিতা হযরত আলী কারামাল্রাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম উনারই অনুসারী এবং আহলে বাইত-এর ভক্ত আমরাতো হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে সমর্থন করিনি তাঁর অনুপযুক্ত ছেলে ইয়াযীদকে মানার প্রশ্নই উঠতে পারে না আমরা আপনার পিতা হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম  আপনার ভাই হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম উনার সমর্থনকারী আমরা ইয়াযীদের অনুসারী নই ইয়াযীদ এখন তখতারোহন করেছে, কিন্তু আমরা ইয়াযীদকে খলীফা বা ইমাম মানতে পারি না আপনাকেই আমাদের ইমাম, আমাদের খলীফা বলে মনে করি আপনি মেহেরবানী করে কূফায় তাশরীফ আনুন আমরা আপনার হাতে বাইয়াত হবো এবং আপনাকে খলীফা হিসেবে গ্রহণ করবো আপনার জন্য আমাদের মাল-জান কুরবান করতে প্রস্তুত আছি এবং আপনার হাতে বাইয়াত হয়ে আপনার অনুসরণে জিন্দেগী অতিবাহিত করতে ইচ্ছুক তাই আপনি আমাদের কাছে তাশরীফ আনুন আমাদের প্রতি মেহেরবানী করুন এবং আমাদেরকে আপনার ছোহবতে রেখে আপনার ফয়েজ-বরকত দ্বারা আমাদেরকে উপকৃত করুন" সমস্ত কাবিলা খানদানের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে এই ধরণের চিঠি এসেছিল
অনেকেই এই ধরণের চিঠিও লিখেছিল, "হে মহান ইমাম, আপনি যদি আমাদের কাছে না আসেন, আমাদেরকে বাধ্য হয়ে ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত হতে হবে; কারণ সরকারের মোকাবেলা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় কাল কিয়ামতের মাঠে আল্লাহ্ তায়ালা যখন জিজ্ঞেস করবেন- কেন আমরা নালায়েক ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করলাম, তখন আমরা পরিস্কার বলব, হে মওলা! আমরা আপনার পেয়ারা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লাম উনার দৌহিত্রের কাছে চিঠি লিখেছিলাম, সংবাদ পাঠিয়েছিলাম, মাল-জান কুরবানী করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি তাশরীফ আনেননি এবং আমাদের দাওয়াত গ্রহণ করেননি তিনি যখন অগ্রাহ্য করলেন, আমরা বাধ্য হয়ে ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত হয়েছি তাই হে ইমাম! আপনি স্মরণ রাখবেন, আমাদের বাইয়াতের জন্য আপনিই দায়ী হবেন

হযরত ইমাম মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কূফা গমনঃ
কূফাবাসীদের পক্ষ থেকে ধরনের চিঠি লিখার পরিপ্রেক্ষিতে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম চিন্তা করলেন যে, সেখানে তিনি যাবেন কি না তিনি অনেকের সাথে বিষয়ে পরামর্শ করলেন এবং শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, প্রথমে একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিকে পাঠাবেন, যিনি সেখানে গিয়ে স্বচক্ষে অবস্থা যাচাই করে দেখবেন যে, ওরা বাস্তবিকই উনাকে চায় কি না? উনার প্রতি সত্যিই আন্তরিক মুহব্বত বিশ্বাস আছে কি না? সঠিক সংবাদ পাওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবেন, তিনি যাবেন কি যাবেন না অতঃপর তিনি তাঁর চাচাতো ভাই হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহিকে কাজের জন্য মনোনীত করলেন এবং ফরমালেন, প্রিয় মুসলিম! কূফা থেকে যেভাবে চিঠি আসছে তা যাচাই করে দেখার জন্য তোমাকে আমার প্রতিনিধি করে সেখানে পাঠানোর মনস্থ করেছি তুমি সেখানে গিয়ে স্বচক্ষে অবস্থা উপলব্ধি এবং যাচাই করে যদি অবস্থা বাস্তবিকই সন্তোষজনক মনে কর, তাহলে আমার কাছে চিঠি লিখবে চিঠি পাওয়ার পর আমি রওয়ানা হবো, অন্যথায় তুমি সেখান থেকে চলে আসবে তাঁর চাচাতো ভাই হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি যাবার জন্য তৈরি হয়ে গেলেন হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম কূফাবাসীদের কাছে একটি চিঠি লিখলেন- ‘ওহে কূফাবাসী! পরপর তোমাদের অনেক চিঠি আমার কাছে পৌঁছেছে তাই আমি আমার চাচাতো ভাই হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহিকে আমার প্রতিনিধি করে তোমাদের কাছে পাঠালাম তোমরা সবাই তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করো এবং তাঁর খিদমত করো তিনি তোমাদের মনোভাব যাচাই করে আমার কাছে চিঠি লিখবেন, যদি তোমাদের মনোভাব সন্তোষজনক হয়, তাঁর চিঠি আসার পর পরই আমিও তোমাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যাবএভাবে চিঠি লিখে সীল মোহর লাগিয়ে হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহিকে দিলেন এবং উনাকে বিদায় দিলেন হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর দুই ছেলে হযরত মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত ইব্রাহীম রহমতুল্লাহি আলাইহিও তৈরি হয়ে গেলেন তাঁরা বলতে লাগলেন, আব্বাজান! আমাদেরকে ফেলে যাবেন না, আমাদেরকেও সাথে নিয়ে যান হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ছেলেদের অন্তরে আঘাত দিতে চাইলেন না তাই তাঁর ছেলেদ্বয়কেও সাথে নিয়ে নিলেন অতঃপর তিনি মক্কা শরীফ থেকে মদীনা শরীফ গেলেন এবং আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করার পর কূফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন


হযরত ইমাম মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর প্রতি প্রাণঢালা সংবর্ধনা
কূফায় পৌঁছে মুখতার বিন উবায়দুল্লাহ সাকফী, আমন্ত্রণকারীদের মধ্যে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আহলে বাইত-এর অনুরক্ত ছিল, তার ঘরেই হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তাশরীফ রাখলেন যখন কূফাবাসীরা খবর পেল যে, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এর প্রতিনিধি হয়ে এসেছেন তখন কূফাবাসীরা দলে দলে এসে তাঁর হাতে বাইয়াত হতে লাগলো অল্প দিনের মধ্যে চল্লিশ হাজার লোক তাঁর হাতে বাইয়াত হয়ে গেল এবং এমন ভালবাসা মুহব্বত দেখালো যে, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি অভিভূত হয়ে গেলেন তাঁর পিছে পিছে লোক চলাফেরা করছে, দিন-রাত মেহমানদারী করছে, তাঁর হাতে-পায়ে চুম্বন করছে এবং একান্ত আনুগত্যের পরিচয় দিচ্ছে এতে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হলেন এবং মনে মনে বললেন, এরাতো সত্যিই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বড়ই আশিক এবং উনার জন্য একেবারে ফানা তিনি ভাবলেন, আমাকে পেয়ে তাদের যে অবস্থা হয়েছে, জানিনা, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম আসলে তারা কী যে অবস্থা করবে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি এভাবে পরিতৃপ্ত হয়ে সমস্ত অবস্থার বর্ণনা দিয়ে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে চিঠি লিখলেন- "চল্লিশ হাজার লোক আমার কাছে বাইয়াত হয়েছে, সব সময় আমার সাথে সাথে রয়েছে, আমার যথেষ্ট খিদমত করছে এবং তাদের অন্তরে আপনার প্রতি অসীম মুহব্বত রয়েছে তাই আপনি আমার চিঠি পাওয়া মাত্রই চলে আসুন এখানকার অবস্থা খুবই সন্তোষজনক" এভাবে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার নিকট চিঠি লিখলেন পত্র-বাহক পত্র নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেল

কূফাবাসীর বেঈমানী
ইয়াযীদের অনুসারীদের মধ্যেও অনেকে কূফায় অবস্থান করতো তারা যখন দেখলো, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি -এর হাতে চল্লিশ হাজার লোক বাইয়াত গ্রহণ করেছে, তখন তারা ইয়াযীদকে ব্যাপারটা জানিয়ে উস্কানীমূলক চিঠি দিল তারা ইয়াযীদকে লিখলো যে, ওহে ইয়াযীদ! তুমিতো নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছো, আর এদিকে তোমার বিরুদ্ধে কূফায় বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠছে, যা তোমার পক্ষে প্রতিরোধ করা খুবই কষ্টসাধ্য হবে তোমারতো খবরই নেই, তোমার বিরুদ্ধে চল্লিশ হাজার লোক বাইয়াত হয়েছে এবং আরও লোক বাইয়াত হচ্ছে যদি এভাবে চলতে থাকে, তাহলে এখান থেকে এমন এক ভয়ানক ঝড়-তুফানের সৃষ্টি হবে, যা তোমাকে খড়-কুটার ন্যায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে তাই তুমি যেভাবেই হোক এটাকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করোযখন ইয়াযীদ খবর পেল, সে খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলো সে অবহিত আছে যে, রাজ-ক্ষমতা বড় জিনিস কেউ নিজ ক্ষমতা সহজে ত্যাগ করতে চায় না আপ্রাণ চেষ্টা করে সেই ক্ষমতা, সেই সিংহাসন আঁকড়ে রাখতে চায় তাই ইয়াযীদের কাছেও যখন তার রাজত্ব হুমকির সম্মুখীন মনে হলো, তখন কূফার গভর্নরনোমান বিন বশীরযিনি হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি -এর বিরুদ্ধে কোন প্রতিকার নেননি, তাকে পদচ্যূত করলো এবং তার স্থলে ইবনে যিয়াদ যার আসল নাম ছিলউবাইদুল্লাহযে বড় যালিম কঠোর ব্যক্তি ছিল এবং যে বছরার গভর্নর ছিল, তাকে কূফার গভর্নর নিয়োগ করলো এবং তার কাছে চিঠি লিখলো- ‘তুমি বছরার গভর্নরও থাকবে, সাথে সাথে তোমাকে কূফারও গভর্নর নিয়োগ করা হলো তুমি শীঘ্রই কূফা এসে আমার বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়েছে, তা যেভাবে হোক দমিয়ে ফেলো, ব্যাপারে যা করতে হয়, তা করার জন্য তোমাকে পূর্ণ ইখতিয়ার দেয়া হলো যেভাবেই হোক, যে ধরনের পদক্ষেপই নিতে হোক না কেন, বিদ্রোহকে নির্মূল করে দাওইবনে যিয়াদ ইয়াযীদের পক্ষ থেকে পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে কূফায় আসলো সে কূফায় এসে সর্বপ্রথম যে কাজটা করলো, তা হচ্ছে যতগুলো বড় বড় সর্দার ছিল এবং যারা হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সাথে ছিল বাইয়াত গ্রহণ করেছিল, তাদের সবাইকে বন্দী করে ফেললো এবং বন্দী করার পর কূফার গভর্নর হাউজে নজরবন্দী করে রাখলো তাদের এই বন্দীর কথা বিদ্যুৎ বেগে সমগ্র কূফায় ছড়িয়ে পড়লো এবং এতে সমস্ত লোক হতভম্ব মর্মাহত হলো সবাই চিন্তিত হলো, এখন কি করা যায়? সমস্ত বড় বড় সর্দারকে বন্দী করছে এবং অনেককে বন্দী করে ফেলেছে এমনকি হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিকেও বন্দী করার কৌশল নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছে যখন হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি দেখলেন যে, বড় বড় সর্দারদেরকে বন্দী করা হয়েছে এবং আরও নতুন-নতুন বন্দী করার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন তিনি তাঁর সমস্ত অনুসারী বাইয়াত গ্রহণকারীদের আহবান করলেন তাঁর ডাকে সাথে সাথে সবাই এসে সমবেত হয়ে গেল চল্লিশ হাজার ব্যক্তি যারা তাঁর হাতে বাইয়াত করেছিল, তারা সবাই সমবেত হলো তিনি তাদের হুকুম দিলেন, গভর্নর ভবন ঘেরাও করো হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি সেই চল্লিশ হাজার অনুসারীদেরকে নিয়ে গভর্নর ভবন ঘেরাও করলেন তখন অবস্থা এমন উত্তপ্ত ছিল, তিনি একটু ইশারা করলে চল্লিশ হাজার লোক এক মূহূর্তের মধ্যে গভর্নর ভবন ধুলিস্যাৎ করে ফেলত এবং ইবনে যিয়াদ এর কোন প্রতিরোধ করতে পারতো না কারণ, চল্লিশ হাজার লোকের মোকাবেলা করার ক্ষমতা তখন তার ছিল না এমনকি তখন তার কাছে এত সৈন্যও ছিল না হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন চল্লিশ হাজার লোক নিয়ে গভর্নর ভবন ঘেরাও করলেন, তা দেখে ইবনে যিয়াদ খুবই ভয় পেল তবে সে চালাকী ধোঁকাবাজির আশ্রয় নিল যেসব বড় বড় সর্দারদেরকে গভর্নর ভবনে নজরবন্দী করে রাখা হয়েছিল, তাদের সবাইকে একত্রিত করে বললো, দেখুন আপনারা যদি আপনাদের পরিবার-পরিজনের মঙ্গল চান তাহলে আমার পক্ষ অবলম্বন করুন আমাকে সহযোগিতা করুন নচেৎ আমি আপনাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দিব এবং আপনাদের পরিবারের আপনাদের সন্তান-সন্ততিদের যে কঠিন পরিণতি হবে, তা দুনিয়াবাসী দেখবে অতঃপর বড় বড় সর্দারেরা বললো, আপনি কি চান? কি ব্যাপারে আমাদের সহযোগিতা চান? ইবনে যিয়াদ বলল- যারা মুহূর্তে গভর্নর ভবন ঘেরাও করে রেখেছে, তারা হয়তো আপনাদের ছেলে হবে বা ভাই হবে বা অন্য আত্মীয় স্বজন হবে আমি এখন আপনাদেরকে গভর্নর ভবনের ছাদের উপর উঠাচ্ছি, আপনারা নিজ নিজ আপনজনদেরকে ডেকে বুঝান, যেন তারা ঘেরাও প্রত্যাহার করে নেয় এবং হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গ ত্যাগ করে যদি আপনারা এই রকম না করেন, তাহলে সবার আগে আপনাদের হত্যা করার নির্দেশ দিব এবং অতি সহসা আমার যে সৈন্য বাহিনী আসছে তারা কূফা আক্রমণ করবে, আপনাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হবে এবং আপনাদের শিশুদেরকে বর্শার অগ্রভাগে উঠানো হবে অর্থাৎ আপনাদের কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে তাই আমি আপনাদেরকে বলছি- আমার পক্ষ অবলম্বন করুন, যদি নিজের এবং পরিবার পরিজনের মঙ্গল চান এভাবে যখন সে হুমকি দিল তখন বড় বড় সর্দারেরা ঘাবড়িয়ে গেল এবং সবাই বলতে লাগল, ইবনে যিয়াদ! আপনি যা করতে বলেন আমরা তাই করবো ইবনে যিয়াদ বললো, চলুন, ছাদে উঠুন এবং আমি যেভাবে বলি সেভাবে করুন সর্দারেরা সাথে সাথে ছাদের উপর উঠলো এবং নিজ নিজ আপনজনদেরকে ডাকতে লাগলো ডেকে চুপি চুপি বুঝাতে লাগলো, দেখ, ক্ষমতা এখন ইয়াযীদের হাতে, সৈন্য বাহিনী ইয়াযীদের হাতে, অস্ত্র-শস্ত্র, ধন-সম্পদ ইয়াযীদের হাতে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম অবশ্যই রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বংশধর কিন্তু তাঁর কাছে না আছে রাজত্ব, না আছে সম্পদ, না সৈন্য-সামন্ত, না অস্ত্র-শস্ত্র তাই তিনি সৈন্য-সামন্ত, অস্ত্র-শস্ত্র ধন সম্পদ ব্যতিরেকে কিভাবে ইয়াযীদের মোকাবিলা করবেন? মাঝখানে আমরা বিপদগ্রস্ত হবো এটা রাজনৈতিক ব্যাপার তাই তোমরা এখন ঘেরাও উঠিয়ে নাও এবং হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গ ছেড়ে দাও স্মরণ রেখ, তোমরা যদি এরকম না করো, তাহলে না তোমরা আমাদের মুখ দেখবে আর না আমরা তোমাদের মুখ দেখবো আমাদেরকে এখনি কতল করে ফেলবে আর তোমাদের পরিণামও খুব ভয়াবহ হবে যখন বড় বড় সর্দারেরা নিজ নিজ আপন জনদেরকে বুঝাতে পরামর্শ দিতে লাগলো, তখন লোকেরা অবরোধ ছেড়ে দিয়ে নীরবে চলে যেতে লাগলো দশ-বিশজন করে এদিক-ওদিক থেকে লোক চলে যেতে লাগলো হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি চল্লিশ হাজার লোক নিয়ে গভর্নর ভবন ঘেরাও করেছিলেন কিন্তু আসরের পর মাগরিবের আগে মাত্র পাঁচশ জন লোক ছাড়া বাকী সব চলে গেল এতে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি খুবই মর্মাহত হলেন তিনি ভাবলেন, চল্লিশ হাজার লোক থেকে সাড়ে ঊনচল্লিশ হাজার চলে গেছে, কেবল পাঁচশ জন রয়ে গেল, তাদের উপরও বা কতটুকু আস্থা রাখা যায়? হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন অবস্থা দেখলেন, তখন যে পাঁচশ জন ছিল, তিনি তাদেরকে বললেন, চলুন আমরা জামে মসজিদে গিয়ে মাগরিবের নামায আদায় করি নামাযের পর পরামর্শ করব- কি করা যায়? সবাই বললেন, ঠিক আছে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি পাঁচশ লোককে নিয়ে মসজিদে গেলেন তখন নামাযের সময় হয়ে গেছে আযান হয়েছে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন পাঁচশ জন পিছনে ইক্তিদা করলো হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিন রাকায়াত ফরয নামায পড়ার পর যখন সালাম ফিরালেন, তখন দেখলেন, পাঁচশ জনের মধ্যে একজনও নেই আশ্চর্য! সকালে চল্লিশ হাজার লোক সাথে ছিল, এখন মাগরিবের পরে একজনও নেই! এরা তারাই, যারা নিজেদেরকে আহলে বাইত-এর একান্ত ভক্ত বলে দাবি করতো, যাদের পূর্ব পুরুষেরা আহলে বাইত-এর অনুসারী দাবীদার ছিল এরাই চিঠি লিখেছিল, এরাই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে কূফায় আসার জন্য আহবান জানিয়েছিল, এরাই জান-মাল কুরবানীর জন্য নিশ্চয়তা দিয়েছিল! এরাই হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল এবং বড় বড় শপথ করে ওয়াদা করেছিল যে, তারা জান দেবে তবুও তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করবে না কিন্তু তাদের প্রাণও দিতে হলো না, তীর দ্বারা আহতও হতে হলো না, না তরবারি দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হলো, কেবল ইবনে জিয়াদের ধমকেই হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গ ছেড়ে দিল এবং বিশ্বাসঘাতকতা করলো! হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি নামায শেষে আল্লাহ পাককে স্মরণ করছিলেন এবং মনে মনে ভাবছিলেন, এখন কী করা যায়? সব লোকতো আমাকে ছেড়ে চলে গেল আর এদিকে আমিতো হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে চিঠি লিখে দিয়েছি যে, এখানকার অবস্থা খুবই সন্তোষজনক এখানকার লোকদের মনে তাঁর প্রতি আন্তরিক অসীম মুহব্বত রয়েছে চিঠি পাওয়ার পর হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এক মুহূর্তও বিলম্ব করবেন না তিনি খুব তাড়াতাড়ি এসে যাবেন তখন কী যে প্রতিক্রিয়া হবে, যখন এসে দেখবেন এসব লোকেরা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এসব চিন্তা-ভাবনা নিয়ে তিনি মসজিদ থেকে বের হয়ে নিজ মুরীদের কাছে গেলেন কিন্তু যেই মুরীদের কাছেই গেলেন, দেখলেন যে, ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ডাকাডাকি করার পরও ঘরের দরজা খুলছে না হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি রাত্রে কুফার রাস্তায় এমনভাবে অসহায় অবস্থায় ঘুরে বেড়াতে লাগলেন যেমন একজন সহায়-সম্বলহীন মুছাফির ঘুরাফিরা করে তিনি বড় পেরেশানীর সাথে অলি-গলিতে হাঁটতে লাগলেন এভাবে ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় গিয়ে এক বৃদ্ধা মহিলাকে দেখলেন, যিনি ঘরের দরজা খুলে বসেছিলেন তিনি তার কাছে গিয়ে পানি চাইলেন বৃদ্ধা পানি দিলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কে? কোথা থেকে এসেছেন, কার সঙ্গে দেখা করবেন এবং কোথায় যাবেন? যখন বৃদ্ধা মহিলাটি তাঁর অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন, তখন তিনি অকপটে বললেন, ওহে বোন! আমি মুসলিম বিন আক্বীল, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম  উনার প্রতিনিধি হয়ে কূফায় এসেছিলাম মহিলাটি আশ্চর্য হয়ে বললেন, আপনি মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি! আপনি এভাবে অসহায়ভাবে ঘুরাফিরা করছেন! কূফার সবাই জানে যে, আপনার হাতে হাজার হাজার লোক বাইয়াত হয়েছে এবং সবাই আপনার জন্য জান-মাল কুরবান করতে প্রস্তুত কিন্তু এখন আমি কী দেখছি! আপনি যে এভাবে অসহায়, একাকী ঘুরাফিরা করছেন? হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, ‘হ্যাঁ বোন’! বাস্তবিকই তা ছিল কিন্তু তারা আমার সাথে বেঈমানী করেছে তাই আপনি আমাকে এই অবস্থায় দেখছেন কূফার কোন ঘরের দরজা আজ আমার জন্য খোলা নেই, এমন কোন জায়গা নেই যেখানে আমি রাত্রি যাপন করতে পারি এবং আশ্রয় নিতে পারি বৃদ্ধা মহিলা বললেন, আমার গরীবালয় আপনার জন্য খোলা আছে আমার জন্য এর থেকে বড় সৌভাগ্য আর কি হতে পারে যে, রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একজন আওলাদ আমার ঘরে মেহমান হয়েছেন সেই বৃদ্ধাটি উনাকে ঘরে জায়গা দিলেন শেষ পর্যন্ত তিনি তার ঘরে আশ্রয় নিলেন সেখানে তিনি রাত যাপন করলেন খোদা তায়ালার কুদরত! বৃদ্ধার এক ছেলে ছিল বড় নাফরমান এটা খোদা তায়ালারই শান যে, নেককার থেকে বদকার এবং বদকার থেকে নেককার পয়দা হয়। মহান আল্লাহ পাকের কুদরত, মুমিনের ঘরে কাফির এবং কাফিরদের ঘরে মুমিন দেখা যায় ফিরআউনের স্ত্রী শ্রেষ্ঠ ঈমানদার আর হযরত লূত আলাইহিস সালাম-এর স্ত্রী হয়ে যায় কাফির কাফিরের গৃহে লালিত-পালিত হয়েছেন নবী-রসূল আর হযরত নূহ আলাইহিস সালাম-এর ঘরে জন্ম লালিত-পালিত কেনান হয়ে যায় কাফির বৃদ্ধা মহিলার ক্ষেত্রেও তাই তিনি নেককার কিন্তু তার ঘরেই জন্ম নিয়েছে এক বড় নাফরমান শেষ রাতে বৃদ্ধার সেই নাফরমান ছেলে ঘরে আসলো, এসে মাকে পেরেশান দেখে জিজ্ঞাসা করলো, মা তুমি চিন্তিত কেন? মা বললেন, বৎসখোদা তায়ালা আমাকে সৌভাগ্যবান করেছেনমুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি, যিনি প্রিয় নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খানদানের একজন আজ তিনি আমার ঘরে মেহমান এবং আমার ঘরে অবস্থান করছেন তাই আমি খুবই আনন্দিত, আর অন্যদিকে খুবই দুঃখিত মর্মহত, কেননা কূফাবাসীরা একজন সম্মানিত মেহমানের সাথে ধরনের বেঈমানী করেছে
তাঁর সেই নাফরমান ছেলে মনে মনে খুবই খুশি হলো এবং মনে মনে বলতে লাগলো- শিকার হাতের মুঠোয়, এটাতো বড় সৌভাগ্যের বিষয় নাঊযুবিল্লাহ! আমার মাতো একজন সাধা-সিধে মহিলা তিনি কি জানেন ইবনে জিয়াদের ঘোষণার কথা? ইবনে যিয়াদ তো ঘোষণা করেছে, যে ব্যক্তি হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহিকে গ্রেফতার করতে পারবে, তাকে এক হাজার দিরহাম পুরস্কার দেয়া হবে যা হোক, তিনি যখন সৌভাগ্যবশতঃ আমার ঘরে এসে গেছেন, আমি খুবই সকালে গিয়ে খবর দিয়ে উনাকে আমার ঘর থেকে গ্রেফতার করাবো এবং হাজার দিরহাম পুরস্কার লাভ করবো ছেলে এই অসৎ উদ্দেশ্য ইচ্ছা তার মা জানতে পারলেন না এদিকে সে অস্থির হয়ে পড়লো, কখন সকাল হবে, কখন খবর পৌঁছাবে এবং পুরস্কার লাভ করবে ফজর হওয়া মাত্রই সে ইবনে যিয়াদকে খবর দিলো যে, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি ওর ঘরেই অবস্থান করছেন, সে হলো সংবাদদাতা এবং সেই পুরস্কারের দাবিদার ইবনে যিয়াদ বললো, তোমার পুরস্কার তুমি নিশ্চয়ই পাবে, প্রথমে উনাকে গ্রেফতার করার ব্যবস্থা করো সে বললো, ঠিক আছে, আমার সাথে সিপাই পাঠিয়ে দিন তার কথা মতো তার সাথে সত্তরজন সিপাই গেল এবং সেই মহিলাটির ঘর চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেললো হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি এই অবস্থা দেখে তলোয়ার নিয়ে বের হলে সিপাইরা জঘন্যভাবে বেয়াদবী করলো এবং এমন ভাষা উচ্চারণ করলো, যা মোটেই বরদাশতযোগ্য নয় ওরা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কঠোর সমালোচনা করলো এবং ইয়াযীদের প্রশংসা করলো আর তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগ আনলো হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি এর যথার্থ উত্তর দিলেন কিন্তু ইত্যবসরে ওরা তীর নিক্ষেপ করলো হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, যদি আলোচনা করতে চাও তাহলে বুদ্ধিমত্তার সাথে আলোচনা করো আর যদি তীর নিক্ষেপ করো আমিও এর যথোচিত জবাব দিব ওরা বললো, ঠিক আছে, শক্তি থাকলে জবাব দিন তাদের কথা শুনে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তাদের সামনা-সামনি এসে গেলেন এবং তলোয়ার চালাতে শুরু করলেন তিনি একাই সত্তরজনের সাথে মোকাবিলা করতে লাগলেন আর এদিকে ওরা তাঁর বীরত্বপূর্ণ আক্রমণে হতভম্ভ হয়ে গেল হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সুনিপূণ তলোয়ার চালনার সামনে ওরা টিকতে না পেরে পিছপা হলো তবুও তিনি কয়েক জনকে হত্যা করতে সক্ষম হলেন এবং অনেককে আহত করলেন এই অবস্থায় তিনি নিজেও আহত হলেন একটা তীরের আঘাতে উনার সামনের দাঁত ভেঙ্গে গেল রক্ত বের হচ্ছিল তখন তিনি বৃদ্ধা মহিলাটির কাছ থেকে পানি চাইলেন মহিলাটি উনাকে পান করার জন্য এক পেয়ালা পানি দিলেন যখন তিনি পানি পান করতে মুখে নিলেন, তখন সেই পানি মুখের রক্তে লালে লাল হয়ে গেল শেষ পর্যন্ত তিনি পানি পান করলেন না পেয়ালাটা মাটিতে রেখে তিনি মনে মনে বললেন, "হয়তঃ দুনিয়ার পানি আমার ভাগ্যে আর নেই আমি জান্নাতুল ফিরদাউস- গিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করবো"

হযরত ইমাম মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর শাহাদাত
হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি পুনরায় লড়তে শুরু করলেন খবর যখন ইবনে জিয়াদের কাছে পৌঁছলো তখন সে মুহম্মদ বিন আশআছকে পাঠালো এবং তাকে বললো, তুমি গিয়ে কুটনৈতিক রাজনৈতিক পন্থায় উনাকে বন্দী করে আমার কাছে নিয়ে এসো সে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কাছে এসে বললো, ‘ওরা আসলে বোকামী করেছে ওদেরকে ইবনে যিয়াদ মোকাবিলা বা লড়াই করার জন্যে পাঠায়নি ওদেরকে পাঠানো হয়েছিল আপনাকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপনি আমার সাথে গভর্নর ভবনে চলুন আপনি গভর্নরের সাথে কথা বলুন, তিনি আপনার সাথে মত বিনিময় করতে চান কারণ তিনি চাচ্ছেন, ইত্যবসরে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামও কূফায় এসে পৌঁছবেন তাই যেন কোন ফিতনা-ফাসাদের সৃষ্টি না হয় গভর্নরের কাছে চলুন, কথাবার্তার মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হোন মত বিনিময়ের মাধ্যমে হয়ত সন্ধিও হয়ে যেতে পারে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, আমিও তো তাই চাচ্ছি তানা হলে আমি যখন চল্লিশ হাজার সমর্থক নিয়ে গভর্নর ভবন ঘেরাও করেছিলাম তখন আমার একটু ইশারাই গভর্নর ভবন তছনছ এবং ইবনে যিয়াদকে গ্রেফতার করার জন্য যথেষ্ট ছিল কিন্তু আমি এটা নিজে পছন্দ করি না যে, মারামারি বা খুন-খারাবী হোক মুহম্মদ বিন আশআছ বললো, আমার সাথে চলুন, সিপাইদেরকে ধমকের সুরে বললো, তলোয়ার খোলা রাখছো কেন? বেকুবের দল কোথাকার, তলোয়ার খাপের মধ্যে ভরে রাখো এভাবে ওদেরকে ধমক দিল আর উনাকে সাথে নিয়ে চললো হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তার সাথে গেলেন এবং গভর্নর ভবনে প্রবেশ করার সময় তিনি পাঠ করলেন
- ربنا افتح بيننا وبين قومنا بالحق وانت خير الفاتحين
রব্বানাফ্তাহ্ বাইনানা ওয়া বাইনা ক্বওমিনা বিল্হাক্কি ওয়া আংতা খইরুল ফাতিহীন’ (সূরা রাফ-৮৯)
এই দুআটি পড়তে পড়তে যখনই তিনি গভর্নর ভবনের শাহী দরজায় প্রবেশ করলেন, এদিকে ইবনে যিয়াদ উম্মুক্ত তলোয়ারধারী কিছু সিপাহীকে দরজার দুপাশে নিয়োজিত করে রেখেছিল এবং তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি দরজা দিয়ে প্রবেশ করা মাত্রই দুদিক থেকে আক্রমণ করে যেন উনাকে শহীদ করা হয় নির্দেশ মত যখনই তিনি গভর্নর ভবনের দরজায় পা রাখলেন, তখনই তাঁর উপর দুদিক থেকে তলোয়ার দ্বারা আক্রমণ করা হলো এবং সেখানেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন)

উলামায়ে কিরাম-এর কেউ কেউ তাঁদের কিতাবে লিখেছেন যে, তিনি যথারীতি ইবনে জিয়াদের কাছে পৌঁছেছেন এবং আলোচনা করেছেন ইবনে যিয়াদ হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিকে বললো, দেখুন, আপনি বড় অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন তথাপি একটি শর্তে আমি আপনাকে রেহাই দিতে পারি শর্তটি হচ্ছে, আপনি ইয়াযীদের বাইয়াত গ্রহণ করুন এবং প্রতিশ্রুতি দিন যে, যখন হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম আসবেন, উনাকেও ইয়াযীদের বাইয়াত করিয়ে দিবেন এতে সম্মত হলে আপনাকে আমি মুক্তি দিতে পারি অন্যথায় আপনার হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কোন নিস্তার নেই নাঊযুবিল্লাহ হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি উত্তরে বললেন, ‘প্রস্তাব মন্দ নয়, তবে আমি কিংবা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করতে পারি না এটা কখনো কল্পনাও করা যায় না যে, আমরা ইয়াযীদের কাছে বাইয়াত হবো তাই তোমার যা ইচ্ছা তা করতে পারইবনে যিয়াদ পুনরায় বলল, যদি আপনি বাইয়াত গ্রহণ না করেন ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বাইয়াত করানোর ব্যবস্থা না করেন, তাহলে আমি আপনাকে শহীদ করার নির্দেশ দিব হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি দৃঢ়কন্ঠে বললেন, ‘তোমার যা ইচ্ছে তা করতে পারইবনে যিয়াদ জল্লাদকে নির্দেশ দিল, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিকে গভর্নর ভবনের ছাদের উপর নিয়ে গিয়ে শহীদ করো এবং মাথা কেটে আমার কাছে নিয়ে আসো আর দেহকে রশি বেঁধে বাজারে হেঁচড়াও, যাতে হাড় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং লোকেরা যেন এই দৃশ্য অবলোকন করে জল্লাদকে হুকুম করার পর, ওরা যখন উনাকে ধরতে আসল, তখন হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি দেখলেন যে, গভর্নর ভবনের চারিদিকে লোকে লোকারণ্য তারা সব এসেছে তামাশা দেখার জন্য

আফসুস! এদের মধ্যে অনেকে এসেছে যারা হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল, যারা চিঠি লিখে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে কূফায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি ওদেরকে দেখে বললেন, ‘হে কূফাবাসী! তোমরা বেঈমানী করেছ; তা সত্ত্বেও এখন আমি তোমাদেরকে তিনটি কাজের দায়িত্ব দিচ্ছি যদি পার, এই তিনটি কাজ তোমরা অবশ্যই করবে প্রথম কাজ হচ্ছে, আমার কাছে যে হাতিয়ারগুলো আছে, এগুলো বিক্রি করে অমূক অমূককে দিও কারণ, আমি ওদের কাছে ঋণী দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে, যখন আমার মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ইবনে জিয়াদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে এবং আমার লাশ বাইরে নিক্ষেপ করবে, তোমরা আমার লাশটি উঠিয়ে কোন এক যথোপযুক্ত স্থানে দাফন করো তৃতীয় কাজ হচ্ছে, যদি তোমাদের মধ্যে এক তিল পরিমাণও ঈমান থাকে এবং আহলে বাইত-এর প্রতি এক কণা পরিমাণও মুহব্বত থাকে, তাহলে যে কোন উপায়ে তোমরা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে সংবাদ পৌঁছে দিও, যেন তিনি কূফায় তাশরীফ না আনেন

এসব কথা শুনে ইবনে যিয়াদ খুবই রাগান্বিত হলো এবং চারিদিকে ঘুরে সবাইকে হুমকি দিতে লাগলো, খবরদার! যারা হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর এই সব কথামত কাজ করবে, আমি তাদেরকে কতল করাবো এবং তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে বর্শার অগ্রভাগে উঠাবো, যাতে কেউ হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কথা অনুসরণ করতে না পারে এবং সে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিকে লক্ষ্য করে বললো, আমি আপনার হাতিয়ারগুলো আমাদের মুজাহিদ বাহিনীর মধ্যে বণ্টন করবো এবং আপনার লাশকে দাফন করতে দিব না বরং কূফার অলিতে-গলিতে ঘুরাবো এবং জনগণকে দেখাবো যারা আপনার পক্ষ অবলম্বন করবে, নিশ্চয়ই তাদের সাথে এই রকম আচরণ করা হবে আর হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে খবর দেয়া থেকে বাধা দেয়ার কারণ হলো, উনাকে এখানে আনা চাই এবং উনাকেও ইয়াযীদদ্রোহীতার স্বাদ উপভোগ করাতে চাই নাঊযুবিল্লাহ হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার ভবিষ্যত পরিণতির কথা চিন্তা করে তখন ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন এবং কূফাবাসীর বিশ্বাস-ঘাতকতার কথা উনাকে আরও বেঁদনাক্লিষ্ট করল এমন সময় জল্লাদরা উনাকে ধরে ছাদের এক কিনারে নিয়ে গেল তিনি তাদের কাছে দুই রাকায়াত নফল নামায পড়ার অবকাশ চেয়েছিলেন কিন্তু তারা সেই সুযোগটাও দিল না তিনি অশ্রু-সজল নয়নে মক্কা শরীফ-মদীনা শরীফ-এর দিকে তাকালেন এবং তাকিয়ে বললেন, ওগো আমার মাওলা হুসাইন! আমার এই অবস্থার খবর আপনাকে কে পৌঁছাবে? আমার সাথে কী যে নির্মম আচরণ করা হচ্ছে হায়! আমি যদি আপনাকে চিঠি না লিখতাম এবং কূফার অবস্থা সন্তোষজনক না জানাতাম তাহলে আপনি এখানে কখনো আসতেন না কূফাবাসীরা আজ আমার সাথে যেভাবে বিশ্বাস ঘাতকতা করলো, জানিনা, আপনার সাথে কি ধরণের আচরণ করবে? উনি এসব চিন্তায় মগ্ন ছিলেন আর এদিকে জল্লাদরা উনাকে ধরে ছাদে শুইয়ে শরীর মুবারক থেকে মস্তক মুবারক বিচ্ছিন্ন করে ফেললো




No comments:

Post a Comment